You are here
Home > প্রবাস > জাপানের ‘হামামাতসু মাতসুরি’ ঘুড়ি উৎসব

জাপানের ‘হামামাতসু মাতসুরি’ ঘুড়ি উৎসব

জাপানের ‘হামামাতসু মাতসুরি’ ঘুড়ি উৎসব

মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ফাহিম, জাপান: আপনি কি ছোটবেলায় ঘুড়ি উড়িয়েছেন? উড়ন্ত ঘুড়ির সাথে  দিগন্তে পাড়ি দেওয়া কিংবা পাখিদের সাথে পাল্লা দিয়ে ঘুড়ি উড়ানোর সে শৈশব এর কথা কি মনে পড়ে? যখন ছোট ছিলাম তখন খুব করে ঘুড়ি উড়াতাম, ঘুড়ি উড়াতে উড়াতে হারিয়ে যেতাম স্বপ্ন রাজ্যে। সবুজ ক্ষেতের সরু পথ দিয়ে ঘুড়ি হাতে ছুটতাম বাতাসের পিছু পিছু, নাটাইয়ের সব সুতা ছেড়ে দিতাম। খুব উঁচুতে ঘুড়ি উড়াতে আমার খুবই ভালো লাগত। কিন্ত যখন বাতাসের টানে ঘুড়ি ছিঁড়ে যেত তখন খুবই খারাপ লাগত।  ছোটবেলায় গ্রামের বৈশাখের মেলায় সবাইকে দেখতাম ঘুড়ি কিনতে, তারপর আকাশে ভেসে বেড়াত বিভিন্ন রঙের, বিভিন্ন ধরনের ঘুড়ি।একদিকে ঘুড়ি উড়ানোর এবং অন্যদিকে ঘুড়ির সুতায় মাঞ্জা দিয়ে কাটাকাটি খেলার আনন্দ! কাটাঘুড়ির পেছন পেছন বোকার মতন দৌড়তাম, যেন আমার স্বপ্নের পেছনে ছুটছি। এখন আর বাংলার আকাশে এত ঘুড়ি উড়তে দেখিনা। শিশু-কিশোরদের বিনোদন এখন হাতের সেলফোনের মধ্যে আবদ্ধ!

বর্তমানে যান্ত্রিক নগরজীবন আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। ঢাকার আকাশে ঘুড়ি উড়তে খুব কমই দেখা যায়, শুধু পুরনো ঢাকায় পৌষ সংক্রান্তিতে ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব পালন করা হয়। পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি বাঙালিদের কাছে একটি বিশেষ উৎসবের দিন। পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এই দিনকে ঘিরে উৎসবের আয়োজন করা হয়। অন্যদিকে কলকাতার আকাশে বিশ্বকর্মা পুজোর দিন ঘুড়ি ওড়ে। চীন, জাপান আর তাইওয়ানে ঘুড়ি উড়ানো নিয়ে রীতিমতো উৎসবের আয়োজনের কথা শুনে থাকবেন নিশ্চয়ই, সেদিন সরকারি ছুটিও থাকে। এক সময় জাপানের মানুষ নাকি ঘুড়ির নেশায় এমনই বুঁদ হয়ে থাকত যে কোনও কাজই করত না৷ ফলে জাপানে ঘুড়ি ওড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছিল কিন্তু এখন প্রতি বছর জাপানে বিভিন্ন জায়গায় আয়োজন করা হয় ঘুড়ি উৎসবের।

৫ মে জাপানে শিশু দিবস, এই দিবসকে ঘিরে শিশুদের স্বাস্থ্যকর সুন্দর ভবিষৎ কামনায় ঘুড়ি উৎসব পালন করা হয়। জাপানে অনুষ্ঠিত ঘুড়ি উৎসবের মধ্যে সবচেয়ে বড় উৎসবটি হয় শিজুওকায় (হামামাতসুতে), প্রতি বছর মে মাসের ৩-৫ তারিখে ঘুড়ি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, উড়ানো হয় বিশাল বিশাল দৈত্যাকৃতির ঘুড়ি। জাপানে এ সময়টা সরকারি ছুটি থাকে যা গোল্ডেন সপ্তাহ নামে পরিচিত। এ বছর মে মাসের ৪ তারিখ আমি এ উৎসবটি দেখার জন্য হামামাতসুতে যাই এবং রীতিমত অবাক হই ওদের বিশাল আয়োজন দেখে। আমরা সাধারনত সুতা দিয়ে ঘুড়ি উড়াই, এদের ঘুড়িগুলো এত বিশাল যে সুতার পরিবর্তে দড়ি ব্যবহার করতে হয় এবং ৮-১০ জন মিলে উড়াতে হয়। ওরা উৎসবটিকে বলে থাকে ‘হামামাতসু মাতসুরি’, এটি সাধারনত দুই ভাগে বিভক্ত- একদিকে মাঠে ঘুড়ি কাটাকাটি উপভোগ করা, অন্যদিকে একই ধরনের পোশাক পরহিত অবস্থায় বাদ্যযন্ত্র বাজাতে বাজাতে যে প্যারেড অনুষ্ঠিত হয় সেটাতে অংশগ্রহণ করা। এরা ঘুড়িকে বলে মাছিজিরশি, বিভিন্ন শহর থেকে ১৬৪ টি বিভিন্ন আকারের মাছিজিরশি এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে এবং ঘুড়িগুলোতে বিভিন্ন সাংকেতিক চিহ্ন আঁকা থাকে যা তাদের নিজ নিজ শহরকে প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। বলা হয়ে থাকে ১৬’শ শতাব্দীর দিকে এখানকার রাজা তার প্রথম সন্তানের জন্মদিন ঘুড়ি উড়ানোর মাধ্যমে উৎযাপন করেছিলেন এবং ঘুড়িটি বিশাল আকৃতির ছিল যার গায়ে রাজপুত্রের নাম লেখা ছিল।

উৎসবে যে শুধু ঘুড়ি কাটাকাটি উপভোগ করা যায় তা কিন্তু নয়, এখানে অনেক মজার এবং বিভিন্ন ধরনের খাবারের স্টল বসে এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এরা প্রতিবছর কমপক্ষে ২০ লক্ষ লোক এ উৎসব উপভোগ করার জন্য এখানে এসে থাকে।

Top