You are here
Home > প্রবাস > দেশে ফেরা হল না, বিমানবন্দরে মারা গেলেন মোয়াজ্জেম

দেশে ফেরা হল না, বিমানবন্দরে মারা গেলেন মোয়াজ্জেম

দেশে ফেরা হল না, বিমানবন্দরে মারা গেলেন মোয়াজ্জেম

মোস্তফা ইমরান রাজু, মালয়েশিয়া: মূমূর্ষ মোয়াজ্জেম  হোসেন(৩৬) যখন প্রিয় স্বজনদের কাছে যেতে ক্ষণ গুনছেন, যখন ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অসুস্থ স্বামীর প্রতীক্ষায় এতোদিন উদগ্রীব থাকা স্ত্রী হোসনে আরা বেগম, তখনই খবর এলো মোয়াজ্জেম আর নেই। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে বিমানে ওঠার কয়েক ঘন্টা আগে সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেছেন(ইন্না—রাজিউন)। মাত্র তিন মাসের প্রবাস জীবনের সমাপ্তি ঘটলো মুন্সিগঞ্জ শ্রীনগরের মোয়াজ্জেমের। ভাগ্য ফেরাতে এসে লাশ হয়ে দেশে ফিরতে হচ্ছে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যাক্তিটিকে।

বাংলাদেশ বিমানের রাতের ফ্লাইটে চার মে সকালে দেশে ফেরার কথা ছিলো তার। স্ত্রী হোসনে আরা তাই সকালের প্রতীক্ষায় হয়তো নির্ঘুম রাত কাটানোর কথা ভাবছিলেন। দুই সন্তান জিহাদ(১১) ও ইশান(৬) তখনও কিছু বুঝে উঠতে পারেনি।বাবা মৃত চান মিয়া ও মা স্বরুফা বেগমের একমাত্র যক্ষের ধন ছিলো মোয়াজ্জেম হোসেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষ ব্যাক্তিও সে। সন্তানের ফিরে আসার প্রতীক্ষায় অধীর আগ্রহে সময় পার করছিলেন মা।ঠিক এমন সময় কুয়ালালামপুর থেকে জানানো হলো আজ বিমানে উঠছেন না মোয়াজ্জেম। কফিনবন্দি হয়ে তাকে ফিরতে হবে। পরিবারের স্বজনদের কান্নার শব্দে মধ্যরাতের শুনশান নিরাবতা ভেঙে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরের লস্করপুর গ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া। বাবা মারা গেছেন আগেই পরিবারে বৃদ্ধ মা আর স্ত্রী। আছে দু্ই ছেলে যার একজন প্রতিবন্ধি। পুরো পরিবার যার কাঁধে সেই মোয়াজ্জেম হোসেন চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

মোয়াজ্জেমে’র মৃত্যুতে স্বজনদের মতো ভেঙ্গে পড়েন কুয়ালালামপুরের ব্যবসায়ী ফিরোজ খান। যিনি মৃত্যু পথযাত্রী মোয়াজ্জেমকে দেখেছেন কাছ থেকে। স্বজনদের কাছে ফেরার আকুতি জানানো মোয়াজ্জেমকে দেশে পাঠাতে গেলো কয়েকদিন করেছেন অক্লান্ত পরিশ্রম। কুয়ালালামপুরে আমরা প্রবাসী যুবসংঘে’র সাধারন সম্পাদক ফিরোজ খান এ প্রতিবেদককে জানান, দেড় মাস আগে ঊনিশ মার্চ গ্যাস্ট্রিক এর ব্যাথা অনুভব করায় কুয়ালালামপুর সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন মোয়াজ্জেম। মৃত্যুর আগ পযন্ত এই হাসপাতালেই ছিলেন তিনি। অবস্থা খারাপ হওয়ায় সাত দিন আইসিইউ’তেও রাখা হয় তাকে। তাতেও কোন লাভ হয়নি। ধিরে ধিরে আরো খারাপ পরিনতির দিকে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে দেশ থেকে টাকা পাঠিয়ে হাসপাতালের বিল পরিশোধ করে, মোয়াজ্জেমকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব ছিলো না। অসহায় মোয়াজ্জেম মৃত্যু প্রতীক্ষায় কুয়ালালামপুর হাসপাতালে দিন গুনছিলো। বিষয়টি বাংলাদেশ হাইকমিশনেও জানান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

তবে সহায় সম্বলহীন মোয়াজ্জেমের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। সম্প্রতি জোহর বারুতে কর্মরত মোয়াজ্জেমের প্রতিবেশি জামাল আলির মাধ্যমে এ বিষয়ে জানতে পেরে হাসপাতালে ছুটে যান ফিরোজ খান। ব্যাক্তি উদ্যোগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ হাইকমিশন ও বাংলাদেশ বিমানের সঙ্গে কথা বলে সকলের সহযোগীতায় দেশে পাঠানোর সকল বন্দোবস্ত করেন, ফিরোজ খান। বাংলাদেশ হাইকমিশন কর্মকর্তা শাহিদা সুলতানা, বিমানের কান্ট্রি ম্যানেজার সালাহউদ্দিন আহমেদ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে সহযোগীতা করেছেন। তবে নিয়তির কি নির্মম পরিহাস!! এ্যাম্বুলেন্স থেকে বিমানবন্দরে নেয়ার পর বিমানে ওঠার আগমূহূর্তে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে অসুস্থ মোয়াজ্জেম। অচেনা মোয়াজ্জেম সম্পর্কে কথাগুলো বলতে গিয়ে নিজের অজান্তেই চোখের কোনে পানি চলে আসে ফিরোজ খানের। বলেন ‘আমাদের কষ্টটা স্বার্থক হতো যদি জীবিত অবস্থায় মোয়াজ্জেমকে তার স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারতাম। বিমানবন্দরে যাওয়ার পর তার এই মৃত্যু কোনভাবেই মেনে নিতে পারছি না’। বিমানবন্দরে মৃত্যুর আগে প্রতিবেশি জামাল আলির সঙ্গে শেষ কথোপকথনে মোয়াজ্জেম বলেন ‘আমি মনে হয় বাঁচবো না। তুমি আমার সন্তানদের বলো শত কষ্টেও তারা যেন ভিক্ষা না করে’।

ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য তিন মাস আগে সহায় সম্বল বিক্রি করে মালয়েশিয়া আসেন মোয়াজ্জেম হোসেন। সেপাং এর নিলাই এ একটি কন্স্ট্রাকশনে কাজও পেয়ে যান। পেটে ব্যাথা অনুভব করায় ঊনিশ মার্চ ভর্তি হন হাসপাতালে।তারপর লাশ হয়ে দেশে ফিরতে হচ্ছে তাকে।এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মোয়াজ্জেম হোসেনের মরদেহ সেরডাং এর একটি হাসপাতালে রাখা আছে।সকল প্রক্রিয়া শেষে শিগগিরই তাকে দেশে পাঠানো হবে বলে ‘আমরা প্রবাসী যুবসংঘে’র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

Top