You are here
Home > প্রতিক্রিয়া > বীর মুক্তিযোদ্ধা ইয়াদ আলি-একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধের গল্প

বীর মুক্তিযোদ্ধা ইয়াদ আলি-একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধের গল্প

বীর মুক্তিযোদ্ধা ইয়াদ আলি-একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধের গল্প

[ লেখকের কথাঃ  আমি ঐ সকল ভাগ্যবানদের একজন যারা   ’৭১-কে দেখেছিল, যদিও তখন বয়সটা ছিল দশের ঘরে। আত্মীয়-প্রতিবেশী দের মধ্যে অনেকেই ছিল মুক্তিযোদ্ধা। ভাই-ভাতিজা-ভাগিনা হিসাবে তাদের কাছে ছিল আব্দারের অবাধ অধিকার । সে সুবাদে তাদের কাছে শুনতাম মুক্তিযুদ্ধের নানা কাহিনী। পরবর্তী সময়ে অন্যদেরকে শুনাতাম ঐ সকল ঘটনাবলী।  সময় সময় মনে হয় ওগুলোকে লেখা গেলে বর্তমান প্রজন্ম ’৭১ কে হয়তো আরও একটু নিবিড়ভাবে অনুভব করবে। সেই অনুভব থেকেই পেশাদার লেখক না হয়েও  ’৭১ সংক্রান্ত কিছু  গল্প-কাহিনী লিখতে চেষ্টা করছি। এগুলো আসলে ঘটনা আর কল্পনার সংমিশ্রণ।  ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা ইয়াদ আলী’  তেমনি একটি প্রচেষ্টা। ]

উদাস নয়নে খালেদ তাকিয়ে আছে আকাশের পানে।  হাতে তার যক্ষের ধন, প্রিয় ডায়েরী খানা।  এলোমেলো ভাবনায় মনটা ভারাক্রান্ত। আজ ১লা মে। ছুটির দিন।  সারা দুনিয়ায় দিনটি ‘শ্রমিক দিবস’ নামে সুপরিচিত। ১৮৯৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে শ্রমিকরা জীবনের বিনিময়ে তাদের কিছু অধিকার আদায় করে নিয়েছিল। ঐ সংগ্রাম আর আত্মত্যাগকে প্রতি বৎসর নানা কর্মসূচীর মাধ্যমে স্মরণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু খালেদ এসব জেনেছে অনেক অনেক পরে, ক্লাস নাইনে পড়ার সময়। অথচ অতসব জানার অনেক আগে থেকেই খালেদের কাছে ‘১লা মে’ তারিখটি একটি শোকগাথা। কারণটি অবশ্য একেবারেই ব্যক্তিগত।  ১লা মে এলেই তাই খালেদ আনমনা হয়ে যায়। তার মনে পরে বহু বৎসর আগের, সেই ১৯৬৮ সালের ১লা মে’র কথা। যদিও খালেদের বয়স তখন মাত্র ৬ ছিল, কিন্তু তার স্পষ্ট মানে আছে সেদিন সকালে তার ছোট্ট ভাইটি মারা যায়। ঐ বৎসর গোটা দেশজুড়ে প্রায় মহামারী আকারে বসন্ত রোগ দেখা দেয়। খালেদ-দের পরিবারেও  তিনজনে বসন্তে আক্রান্ত হয়। তবে দু’জন আরোগ্য লাভ করে, মারা যায় অনেক অনেক আদরের ছোট ভাইটি, মাত্র দেড় বৎসর বয়সে। আরো একটি অবিস্মরণীয় ‘১লা মে’ আছে খালেদের জীবনে।  সেটি ১৯৭১ সালের ১লা মে।  আসলে গোটা ১৯৭১ সালই খালেদের জীবনখাতায় একটি বিশেষ অধ্যায়। খালেদ ভুলে গেছে ’৮১, ’৯১ ইত্যাদি। কিন্তু ভুলে নি ‘৭১। আসলে ‘৭১কে ভুলা যায় না, ’৭১ ভুলার মত নয়।  এটা তারা উপলব্ধি করে যারা ‘৭১কে পেয়েছিল। বর্তমান প্রজন্ম কিয়ৎপরিমাণেও এটা অনুধাবন করতে পারবে না। তারা তো  মনে করে যে, ১৯৭১ সালে জীবিত থাকলে ফেসবুকে লেখালেখি করেই তারা দেশ স্বাধীন করে ফেলত!  আর কেন-ই বা তেমন করে ভাববে না ?  যে প্রজন্মের যুবকদের জীবনের  স্বপ্ন ‘খাও-দাও ফুর্তি কর, দুনিয়াকো মজা লে লাও’  তারা কী আর বলতে পারবে  ‘যে মাটির চির মমতা আমার অঙ্গে মাখা / যার নদী জল ফুলে ফলে মোর স্বপ্ন আঁকা /  যে দেশের নীল অম্বরে মোর মেলেছে পাখা/ সারাটি জীবন  সে মাটির গানে অস্ত্র ধরি।’ ?

ভাবতে ভাবতেই নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত খালেদ তার প্রিয় ডায়েরীটি খুলে পাতা ওলটাতে শুরু করে।  ১৯৭১-এর অনেক ঘটনাই লিপিবদ্ধ আছে। পরিবারের সবাইকে ডাক দেয়, ১৯৭১ সালের ১লা মের ঘটনাটি শুনার জন্য।

১৯৭১ সাল, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ। ঢাকার পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত হয়ে এসেছে। অবশ্য দেশের অন্যত্র কি অবস্থা উহা জানার তেমন নির্ভরযোগ্য কোন উপায় নেই। তখন তো আর মোবাইল ছিল না! কোন এক দুপুরে খালেদ খানা-পিনা শেষ করে শুয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়ছে। দরজায় কে যেন কড়া নাড়ছে। একরাশ বিরক্তি  নিয়ে খালেদ দরজা খুলল। আলি ভাই! আবেগে-উচ্ছ্বাসে আর বিস্ময়ে খালেদ গলা ফাটিয়ে চীৎকার দিল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে ইয়াদ আলী । খালেদের ভীষণ পছন্দের একজন মানুষ।  খালেদের মামা বাড়ীর  পাশের বাড়ীর লোক ইয়াদ আলী। তিন পুরুষ ধরে তারা খালেদের নানা বাড়ীতে ফাই-ফরমাশ খেটে আসছে। কিন্তু সম্পর্কটা মনিব-ভৃত্যের নয়,  বড়ভাই-ছোটভাইয়ের মত। ঠেকা-বেঠেকায় দিনে-রাতের যে কোন সময়ে একে অন্যের পাশে হাজির থাকে। ইয়াদ আলীর বয়স ৪০-৪৫ হবে, দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে বিশাল মানুষ, মুখভর্তি চাপদাড়ি। খালেদকে কোলে পিঠে করে বড় করেছে। তাই নানাবাড়িতে বেড়াতে গেলে খালেদের সব আবদার ইয়াদ আলীর কাছে। বাড়ীর সবচে উঁচু নারিকেল গাছ থেকে ডাব পারতে হবে, পুকুরে মাছ ধরতে হবে কিম্বা তালের কোন্দা বাইতে হবে ইত্যাদি সব কাজেই সবার আগে ডাক পরে ইয়াদ আলীর। সেই ইয়াদ আলীকে চারিদিকে শত্রু এমন অবস্থায় ঘরের দরজায় দাঁড়ানো দেখে খালেদ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। খালেদের ঘোর কাটল যখন ইয়াদ আলী খালেদকে বুকে  জড়িয়ে  ধরল।

রাতে খাবার পরে বসল গল্পের আসর।  বিষয় গত দু’মাসের ঘটনাবলী। খালেদের বাবার কাছে ইয়াদ আলী শুনল ঢাকার খবর। আর ইয়াদ আলীর কাছে তারা শুনল দেশ-গাঁওয়ের খবরাখবর।  ২৫শে মার্চের সেই কাল রাত্রির পর মানুষ দলে দলে গ্রামে চলে যায়। এই যাবার পথে তারা অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করে। কিন্তু তারপরেও জান বাঁচানোর আশায় মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে ভিড় করছে।  খালেদের বড় খালাও  স্বপরিবারে ২ দিন লাগিয়ে এখানে ওখানে পরবাস খেটে  বাড়ী গিয়ে পৌঁছতে সমর্থ হন।  প্রায় পরিবারে একই ধরণের অবস্থা। অনেক দিন পরে গ্রামের বাড়ী লোকজনে ভরপুর। কিন্তু সেখানেও শান্তিতে থাকার জো নেই। হপ্তা খানেক হয়েছে যে থানা সদরে পাকিস্তানী আর্মি হাজির হয়েছে। তারা ক্যাম্প করেছে কলেজ মাঠে। তখন থেকে গ্রামের জনগণ আতঙ্কে আছে। পাক বাহিনীর দোসর হয়েছে কিছু দালাল। এই দালালগুলো পাক বাহিনীর কাছে খবর সরবরাহ করে কে আওয়ামী লীগ, কে মুসলিম লীগ ইত্যাদি। তবে সবচে আনন্দের আর বিস্ময়কর খবর হল যে, মুক্তিবাহিনী গড়ে ওঠেছে। এরা পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেছে।  দেশের ভেতরে কুষ্টিয়ার কোথায় যেন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার শপথ নিয়েছে।  ইয়াদ আলীর তিন ছেলের মেঝ জন মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেবে বলে গ্রামের আরো আট জন যুবকের সাথে চুপি চুপি চলে গেছে।  ওরা সীমান্ত পার হয়ে ভারতে গিয়ে অস্ত্র চালানো শিখে দেশে ফিরে এসে যুদ্ধে অংশ নেবে।  ভারত বর্ডার খুলে দিয়েছে।  মানুষ দলে দলে ওপারে যাচ্ছে।  কেউ জানের মায়ায়, কেউ ট্রেনিং-এর আশায় আর কেউ দু’কারণেই।  সব শুনে খালেদ যারপরনাই চমৎকৃত হয়। তারও  ইচ্ছে হয় যুদ্ধে যেতে।  আর খালেদের বাবা তো পারলে তখুনি রওয়ানা দেয়। কিন্তু মুশকিল হল যে, খালেদের মা গুরুতর অসুস্থ।  ডাক্তার বলেছে, বাবু হতে আর এক মাসও লাগবে না।

ইয়াদ আলীর তিন কারণে ঢাকায় আসা।  প্রথমতঃ  অনেক লোক বাড়ী গেলেও তার বড় ছেলে আইয়ুব আলী এখনো বাড়ী যায় নি। আইয়ুব আলী চকবাজারে ছোটখাট ব্যবসা করে।  চৈত মাসের তৃতীয় হপ্তায় তার বাড়ী যাবার কথা ছিল, কারণ তার বিয়েও প্রায় পাকাপোক্ত। অথচ সেই আইয়ুব আলীর কোন খবর নেই। তার মা-তো সারাদিন কান্নাকাটি করে। দ্বিতীয়তঃ গত এক মাসেও খালেদ-দের কোন খবর না পেয়ে খালেদের নানীও রাতদিন কান্নাকাটি করে। খবর পেতে হলে ঢাকা আসতে হবে। কিন্তু এই সাহস কারো হচ্ছে না।  শেষমেশ তিনি ইয়াদ আলীর দারস্থ হলেন।  ইয়াদ আলী খালেদের নানীকে ‘বুবু’ ডাকে, আপন নানীর চেয়ে বিন্দু পরিমাণ কম মানে না, জীবনে কোনদিন কোন ব্যাপারে না করতে পারে নি, এবারো পারল না।  তৃতীয়তঃ ঢাকার খবর বিশেষ করে পাক আর্মির চলাফেরা সরজমিনে দেখে নিয়ে গ্রামে ফিরে মুক্তিবাহিনীকে জানানো যাকে বলে কী না গোয়েন্দাগিরি। পরদিন সকাল থেকে ইয়াদ আলী কাজে নামবে। উত্তেজিত-উজ্জীবিত খালেদ বায়না ধরে তাকেও সঙ্গে নিতে। তবে সকলে বুঝিয়ে তাকে নিরস্ত করে।

প্লানমত পরের দিন সকালে বের হয় ইয়াদ আলী,  সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে। সারাদিন চর্কির মত ঘুরেছে, চকবাজার-শ্যামবাজার-সদরঘাট সমস্ত এলাকা চষে ফেলেছে। কিন্তু আইয়ুব আলীর কোন হদিস পায় নি।  দ্বিতীয় দিন আবার বের হল ইয়াদ আলী। বিকাল বেলা ফিরে এল থম থমে চেহারা নিয়ে। খালেদের প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে অনেকক্ষণ কোন কথাই বলল না। তারপরে হু হু করে কেঁদে ফেলল। খোঁজ পাওয়া গেছে, তবে জীবিত নয়, মৃত আইয়ুব আলীর। ২৮শে মার্চ রাতে  চকবাজার থেকে জনা বিশেক দোকানদারকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরেরদিন সকালে নদীর পারে ওদের লাশ পাওয়া যায়। কিন্তু দাফন কড়া সম্ভব হয় নি। শিয়াল-শকুনে খেয়ে ফেলে। আইয়ুব আলীর লাশ দেখেছে এমন দু’জনের সাথে কথাও হয়েছে ইয়াদ আলীর।  তৃতীয় দিনেই ইয়াদ আলী দেশে ফিরতে চেয়েছিল, কিন্তু খালেদের বাবা-মা অনেক বলে কয়ে রেখে দিন। এমন শোকাহত একজন মানুষকে এভাবে একলা ছেড়ে দেয়াটা চরম নির্বুদ্ধিতা।

পরের দিন ছিল ১লা মে। নাস্তা-টাস্তা সেরে ইয়াদ আলী বিদায় নেয়। যাবার আগে খালেদকে বলে যায় প্রস্তুত থাকতে। স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কত সময় লাগবে কেউ বলতে পারে না। ভিয়েতনামীরা ৮ বৎসর ধরে, কাশ্মীরীরা ২৩ বৎসর ধরে সংগ্রাম করছে কিন্তু এখনো স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে নাই। আমাদেরও হয়তো অনেক বৎসর লাগতে পারে। খালেদ যেন মনে মনে প্রস্তুত থাকে যাতে সময়ের ডাকে সারা দিতে পারে।

ঐদিন বিকালের ঘটনা। পাশের বাসার রহিম চাচা আর চাচী এলেন বেড়াতে।  মা চায়ের ব্যবস্থা করতে গেলে তীব্রভাবে নিষেধ করে বললেন, জরুরী কথা আছে। অতএব, সবাই ড্রইং রুমে গিয়ে বসল। খালেদ, খালেদের বাবা-মা, রহিম চাচা-চাচী এমন কি খালেদের ছোটবোন আইরিন-ও।  কারো মুখে কোন কথা নেই। সকলে চেয়ে আছে রহিম চাচার দিকে। চাচা কথা বলতে চেষ্টা করছেন, কিন্তু ঠোঁট জোড়া বারংবার কেঁপে ওঠায় পারছেন না। অবশেষে অনেক কসরতের পর শুরু করলেন।

বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে দেখি ইয়াদ আলী দাঁড়িয়ে আছে। সদরঘাট যাবে। আমি যাব গুলিস্তান। যাক ভালই হল, দু’জনে গপ্ করতে করতে যাওয়া যাবে। অনেকক্ষণ পর একটি বাস এল। আমরা দু’জনেই উঠলাম। ৪-৫ টে সিট বাদে সবগুলো ভরা। বাস চলতে শুরু করল ঢিমেতালে।  অবশ্য রাস্তা প্রায় খালি। পাক-মোটর পার হয়ে কিন্তু হোটেল ইন্টারকণের  একটু আগে হটাৎ  বাস দাঁড়িয়ে গেল। ব্যাপার কী! আসলে কিছু খানসেনা হাত দেখিয়ে বাস থামিয়েছে। দেখলাম দরজা দিয়ে কিছু সৈন্য বাসে উঠলো, তল্লাসি চালানো হবে। হপ্তাখানেক যাবৎ এই ঝামেলা শুরু হয়েছে। যখন-তখন যত্রতত্র যানবাহন থামিয়ে চেক শুরু করে দেয়। কী যে খুঁজে নিজেরাও ঠিকমত জানে না। অথচ প্রায় ক্ষেত্রে চেকের ছুতোয় কাউকে না কাউকে ধরে নিয়ে যায় এবং তারা সাধারণতঃ আর ফিরে আসে না মানে গুম হয়ে যায়।

বাসে ওঠেই অফিসার গোছের এক বদমাশ হাঁক দিল, যাদের কাছে আইডেন্টিটি কার্ড আছে ওটা যেন বের করে। অতঃপর শুরু হল কার্ডগুলো চেক করা। যাদের সাথে কার্ড নেই, তাদেরকে বলা হল বাস থেকে নেমে যেতে।  ইয়াদ আলিও পড়ল সেই দলে। গ্রামের সাদাসিদা মানুষ ইয়াদ আলি কোথায় পাবে  আইডেন্টিটি কার্ড ? ও-তো যিন্দেগিতে ওটা দেখেও-নি , হয়তো নাম-ও শুনে নি।  বাস থেকে নামিয়ে দেয়া হল সাতজনকে, তার মধ্যে দুজন এমন যে ওদের কার্ড খানসেনাদেরকে সন্তুষ্ট করতে পারে নি।  বাকিরা বাসের ভেতরে। ওরা ইঙ্গিত দিল বাস ছাড়তে। ড্রাইভার বেচারা একান্ত অনীহা  সত্ত্বেও বাস স্টার্ট দিতে গেল। কিন্তু ইঞ্জিন চালু হচ্ছে না। বিষয়টি কি কাকতালীয় না কি ড্রাইভারের কারসাজী, ধরতে পারি নি।

ওদিকে রাস্তার ওপরে ওই সাতজনের জেরা শুরু হয়েছে। বেচারাদের কারো মুখ শুকিয়ে গেছে, কেউবা দর দর করে ঘামছে। কারণ ওরা অনুমান করে নিয়েছে যে আজ-ই তাদের যিন্দেগির শেষ দিন।  বদমাশ সৈন্যরা একজনকে নাম জিজ্ঞাসা করল। বেচারা বলল, আবুল হুসেন। ওরা বলল, ঝুঁট বাত। তারপরে বলল, কলেমা পড়তে। বেচারা পড়ল। বদমাশরা বলল, ওটা মুখস্থ করেছ। তুমি যে মুসলমান বিশ্বাস অচ্ছে না। খৎনা করা আছে কী না, দেখতে হবে। লুঙ্গী ওঠাও। আহা-রে অপমান! বেচারা আর কী করে, তাই করতে হল। তাতেও ছাড়া নেই। কোথায় থাকে, কি করে, কৈ যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে ইত্যাদি হাজারো প্রশ্ন। কিন্তু কোন জবাবই তাদের মনঃপুত হচ্ছে না। শেষমেশ সিদ্ধান্ত, বেচারা মুক্তিবাহিনীর চর। অতএব, দাঁড়িয়ে থাক। এবারে অন্য এক জনকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল। কিন্তু যা-ই জিজ্ঞাসা করে, বেচারা ভয়ে আর কান্নার ধমকে কিছুই বলতে পারছে না। শেষে এক সৈন্য লোকটির পিঠে লাথি মেরে বসল। বেচারা গড়িয়ে গিয়ে এক স্থানে কাৎ হয়ে পড়ে রইল। বুঝা যাচ্ছিল না, জ্ঞান আছে না কি হারিয়েছে ? এবার হারামি সৈন্যগুলো পাকড়াও করল ইয়াদ আলিকে। তার মুখ ভর্তি দাড়ি দেখে কলেমা ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করল না। শুধু বলল, পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগান দিতে। কিন্তু ইয়াদ আলি স্লোগান তো দিল-ই না, বরঞ্চ খানসেনাটির চোখে চোখ রেখে বলে ওঠল, “নে-হী, পাকিস্তান মুর্দাবাদ।”  খামোশ খেয়ে যাওয়া সৈন্যদের মধ্যে অফিসারটি রাগে ফেটে পড়ল, কেন ?  ভাঙা ভাঙা উর্দুতে ইয়াদ আলির কম্পনহীন কণ্ঠ গম গম করতে লাগল, “ তোমরা জালেম! আমার নিরপরাধ ছেলেকে তোমরা হত্যা করেছ। হাজার হাজার মানুষকে বিনা অপরাধে খুন করেছ। তোমরা শয়তানের চেলা, তোমরা ফেরাউন। পাকিস্তান মুর্দাবাদ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। জয়বাংলা। বঙ্গবন্ধু জিন্দাবাদ। ইয়াহিয়া মুর্দাবাদ।”  বিনা মেঘে বজ্রপাত হলেও  আমরা এত অবাক হতাম না। আর অফিসারটির বেলায় তো কথাই নেই। হতবিহবল ভাবটা কাটিয়ে উঠে সে পাশে দাঁড়ানো এক সৈন্যের উদ্দেশ্যে বলল, “ফায়ার!”  কিন্তু সৈন্যটি রাইফেল তোলার আগেই নড়ে ওঠল ইয়াদ আলি। মুখোমুখি দাঁড়ানো অফিসারটির নাকে এত জোরে ঘুষি মারল যে, বেচারার নাক তো ভাঙলই, দাঁতও দু-একটা যেতে পারে। বেচারা ছিটকে দুহাত দূরে গিয়ে চিৎ হয়ে পড়ল। ওদিকে গুলি করতে উদ্যত সৈন্যটির রাইফেল এক হ্যাঁচকা টানে  চলে গেছে ইয়াদ আলির  হাতে। কিন্তু ইয়াদ আলি তো রাইফেল চালাতে জানে না! জানলে সে কয়েকটা বদমাশকে ফেলে দিতে পারত!!  অগত্যা ইয়াদ আলি রাইফেলটি লাঠির মত ব্যবহার করতে লাগল। এলোপাথাড়ি বাড়ি পড়তে থাকল কারো মাথায়, কারো মুখে, কারো বুকে বা কারো ঘাড়ে।  তবে কয়েক সেকেন্ড মাত্র। শুনতে পেলাম টানা গুলির আওয়াজ। একটু দূরে দাঁড়ানো এক সৈনিক স্টেনগান দিয়ে ব্রাশফায়ার করছে। গোটা একটি ম্যাগাজিন খালি করা হল ইয়াদ আলির উপরে।

আম্মাগো— এটা কী হল!! আলি ভাইকে ওরা মেরে ফেলল! হাউমাউ করে চীৎকার করে খালেদ তার মা-কে জড়িয়ে ধরল।  খালেদের মা কি সান্তনা দেবেন ? তিনি নিজেও তো কান্না থামাতে পারছেন না। আঁচলে চোখ মুছছেন রহিম চাচী। রহিম চাচা হটাৎ থেমে গেছেন।  কথার খেই হারিয়ে ফেলেছেন।  খালেদের বাবাও নির্বাক-নিশ্চুপ। কেটে গেল অনেকক্ষণ।

তারপরে কি হল ? ধরা গলায় কথা বললেন রহিম চাচী। ইতোমধ্যে আর একটি আর্মি জীপ এসে হাজির হল। ওটি থেকে একজন অফিসার নামতেই সকলে স্যালুট ঠুকল। বুঝা গেল যে আর একটু উপরের রেঙ্কের কেউ হবে । সব শুনে হুকুম দিলেন অবশিষ্ট ৬ জনকে এবং ইয়াদ আলির লাশটা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যেতে। তারপরে বাস ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে দ্রুত ভাগতে বললেন। ড্রাইভারও আর ঝুঁকি না নিয়ে দ্রুত স্টার্ট দিল।  আমি আর দু স্টপেজ পরে নেমে গেলাম। তারপর  ফিরতি বাস ধরে বাসায়  ফিরে এলাম। আসার সময় ইয়াদ আলির লাশটা আর দেখলাম না।

আবার অনেকক্ষণ সকলে চুপচাপ। নীরবতা ভাঙলেন রহিম চাচা। কিন্তু কী বলেছিলেন খালেদের  মনে নেই। সে তখন তার নিজের রুমে গিয়ে বিছানায় উপুর হয়ে কাঁদছে। কান্না যখন শুকিয়ে গেল, তখন  খালেদ বিধ্বস্ত পদক্ষেপে তার পড়ার টেবিল গিয়ে বসল। ডায়েরীটা খুলে মে মাসের ১ তারিখ দেয়া পৃষ্ঠাটি বের করল। এখুনি সব লিখে রাখতে হবে যাতে স্মৃতি থেকে একটি শব্দও ছুটে না যায়। কিন্তু প্রিয় আলী ভাইয়ের প্রতি ভালবাসা আর সম্মান জানিয়ে একটি শিরোনাম দেয়া উচিৎ । ‘ স্বাধীনতা সংগ্রামী ’ ? অর্থ হিসাবে ঠিক আছে, তবে সুকঠিন । তাহলে কি দেয়া যেতে পারে ? বিদ্যুৎ চমকের মত মাথায় আসতেই আর দ্বিতীয় চিন্তা না করে খালেদ বড় বড় অক্ষরে লিখল ‘ বীর মুক্তিযোদ্ধা ইয়াদ আলী’।

খালদ ডায়েরী বন্ধ করল। পিনপতন নীরবতা! অনেকক্ষণ পর এই নীরবতা ভাঙল সাদী, আব্বু! ইয়াদ আলীর পরিবার কি জানতে পেরেছিল এই ঘটনা ? না, বাবা! আড়াই মাস পরে তারা প্রকৃত ঘটনা জানতে পেরেছিল।

আড়াই মাস! হাহাকার করে ওঠে খালেদের স্ত্রী। এত লম্বা সময় তারা কিভাবে পার করেছিল ?’ কিন্তু কি করার ছিল তাদের ? এখনো দেখবে মাজে-মধ্যে কিছু লোক ঘুম হয়ে যায়। পরিবার আশায় আশায় দিন-মাস-বৎসর পার করে, বড়জোর এক আধটা সংবাদ সম্মেলন করে, যেটা একাত্তরে পারত না।

আচ্ছা ইয়াদ আলী কি কোন সার্টিফিকেট পায় নি ?  কিভাবে পাবে ? কে খাটবে ? আর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা দিন দিন পালটানো হচ্ছে। ঐ সকল সংজ্ঞার কোনটিতে ইয়াদ আলী আদৌ পরে কি না সেটাও বুঝি না। আসল সত্য কথা হচ্ছে ইয়াদ আলী আর তার মত লোকেরা কোন কিছু পাবার আশায়  কিছু করে না। এরা জীবনভরে দেয়, কক্ষনো নেয় না। পৃথিবীর সকল দেশে সকল স্বাধীনতা সংগ্রামে এমন কোরবানিওয়ালা লোক অনেক থাকে। এরা পত্রিকার পাতায়, ইতিহাসের অধ্যায়ে আসে না। হয়তো দু’চার জনে জানে এদের সম্পর্কে যেমন আজ তোমরা জানলে। তোমাদের থেকে আবার কেউ জানবে। এভাবে এরা বেঁচে থাকে যুগ যুগ ধরে, লোক-লোকান্তরে , হয়ে যায় কিংবদন্তী। তবে কে কী জানল বা ভাবল সেটা বড় কথা নয়।  তার চেয়েও অনেক বড় কথা আমার দেখা সর্বশ্রেষ্ঠ বীর ‘মুক্তিযোদ্ধা ইয়াদ আলী’। ক্ষমতা থাকলে আমি তাকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ ঘোষণা করতাম। বলতে বলতে খালেদের চোখ বুঝে আসে। ঘুমিয়ে পড়েছে মনে করে সকলে সরে যায়।

খালেদ স্বপ্ন দেখে, তার প্রিয় ইয়াদ আলী ভাইকে। হাসছে! খালেদ-কে কাছে ডাকল। কাছে যেতেই খালেদের কাঁধে হাত রেখে বলল, খালেদ! মনে রেখো স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা অনেক বেশী কঠিন।।

গল্পকার: মোহাম্মদ সালেক পারভেজ

Top